মাহে রমজান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বরকতময় মাস

 মাহে রমজান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বরকতময় মাস 

 মাহে রমজান মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহ তায়ালার এক অনন্য নেয়ামত । এই মাস রহমত , মাগফিরাত ও জাহান্নাম থেকে নাজাতের বার্তা নিয়ে আসে ।  রমজান কেবল একটি মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি , তাকওয়া অর্জন এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ । এ মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে , রোজা ফরজ করা হয়ছে এবং এমন এক রাত রয়েছে , যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম ।

মাহে-রমজান-রহমত,-মাগফিরাত-ও-নাজাতের-বরকতময়-মাস

ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের মধ্যে যাকাতের পরই রোজার স্থান । ইবাদতসমূহের মধ্যে রোজার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে । রোজা দ্বারা অভ্যাস অবলম্বনে দুঃখী ও নিরন্নদের ক্ষুধার কষ্ট অনুভবের সুযোগ হয় এবং তা দ্বারা গরীবদের প্রতি করুণা এবং দয়া-মমতা সৃষ্টি হয়ে দানশীলতা ও পরোপকার করায় আগ্রহ সৃষ্টি হয় 

পেজ সূচিপত্র ঃ মাহে রমজান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বরকতময় মাস 

মাহে রমজানের পরিচয় ও মর্যাদা

রমজান হল হিজরি বর্ষপঞ্জির নবম মাস । আল্লাহ তায়ালা এই মাসকে অন্যান্য মাসের চেয়ে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন । রমজান শব্দটি "রমদা" ধাতু থেকে এসেছে , যার অর্থ জ্বালিয়ে দেওয়া । অর্থাৎ এই মাস মানুষেরগুনাহসমুহ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয় । হাদিসে এসেছে , রমজান শুরু হলে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় ।

মাহে রমজান হল ইসলামের সবচেয়ে ফজিলত পূর্ণ ও বরকতময় মাস । এই মাসেই মহান আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির হেদায়েতের জন্য পবিত্র কোরআন নাযিল করেছেন । রমজান মাসে রোজা রাখা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের উপর ফরজ করা হয়েছে । এই মাসে ধৈর্য , সহমর্মিতা ও আত্মসংযমের শিক্ষা দেওয়া হয় । এই মাস আল্লাহর রহমত , মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আসে ।

রমজান মাসে রোজা ফরজ হওয়ার গুরুত্ব

রমজান মাসেই মুসলমানদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে । রোজা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি । সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার , সহবাস ও কিছু নির্দিষ্ট কাজ থেকে দূরে থাকাই রোজা । তবে রোজার মূল লক্ষ্য হল তাকওয়া অর্জন - আল্লাহ্‌ ভীতি ও আত্মসংযম গড়ে তোলা । রোজা মানুষের অন্তরকে নরম ও পবিত্র করে । রমজান মাসে রোজার সওয়াব  বহুগুণে বৃদ্ধি করে ।

আল্লাহ তায়ালা কোরআনে স্পষ্টভাবে রোজা ফরজ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন । রোজা মানুষের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে । রোজার মাধ্যমে আত্মসংযম ও ধৈর্যের অনুশীলন হয় । রমজানের রোজা গুনাহ মাফের বিশেষ সুযোগ এনে দেয় । রোজা পালনকারী আল্লাহর  বিশেষ রহমতের অধিকারী হয় । রোজা ঈমানকে শক্তিশালী করে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ায় ।

 আরও পড়ুন: মাহে রমজান মাস খুব ফজিলত পূর্ণ 

রমজান ও কোরআনের গভীর সম্পর্ক

রমজান মাসকে কোরআনের মাস বলা হয় , কারণ এই মাসেই পবিত্র কোরআন নাযিল  হয়েছে । আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলেন, "রমজান মাস , যাতে কোরআন নাযিল করা হয়েছে - যা মানবজাতির জন্য হেদায়েত।" তাই এই মাসে বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত , অনুধাবন ও আমল করা অত্যন্ত ফজিলত পূর্ণ । রমজান মানুষকে কোরআন মুখী করে তোলে ।

কোরআন মানুষকে তাকওয়ার পথে পরিচালিত করে । রমজানের লক্ষ্যই হল তাকওয়া অর্জন । তাই রমজান ও কোরআনের লক্ষ্য এক ও অভিন্ন ।কোরআন ছাড়া রমজানের পূর্ণতা আসে না । রমজান ছাড়া কোরআনের মর্যাদা উপলদ্ধি করাও কঠিন । কোরআনই রমজানে ইবাদতের মূল প্রেরণা । কোরআন মানুষের চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখে । রমজান সেই চরিত্র গঠনের অনুশীলন কাল ।

রহমতের দশক ঃ রমজানের প্রথম দশ দিন

রমজানের প্রথম দশ দিনকে রহমতের দশক বলা হয় ।এই সময় আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের উপর বিশেষ রহমত বর্ষণ করেন । যারা আন্তরিকভাবে ইবাদতে মনোযোগী হয় , তাদের জন্য আল্লাহর দয়া ও করুণা উন্মুক্ত থাকে । এ সময়ে বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তেগফার করা উত্তম । রমজান মাসের সূচনা হয় ক্ষমা , দয়া ও ভালোবাসার বার্তা নিয়ে । এই দশকে আল্লাহ তায়ালার রহমত বান্দার উপর অবারিতভাবে বর্ষিত হয় ।

এ সময় আল্লাহ বান্দার ছোট আমলেও বড় সওয়াব দান করেন । রোজার মাধ্যমে বান্দা তাকওয়া অর্জনের পথে অগ্রসর হয় । রহমতের দশক আত্মশুদ্ধির উত্তম সুযোগ এনে দেয় । রহমতের দশকে গুনাহ মাফের দরজা খুলে যায় । এই দশকে সদকা ও দান করলে রহমত বৃদ্ধি পায় ।  রহমতের দশকে হৃদয়কে নরম করে দেয় । রহমতের দশক মানুষকে সৎ পথে  ফিরে আসতে সাহায্য করে ।

মাগফিরাতের দশক ঃ রমজানের দ্বিতীয় দশ দিন

রমজানের দ্বিতীয় দশ দিন হল মাগফিরাতের দশক । এই সময়ে আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের গুনাহ ক্ষমা করেন । রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন , যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে , তার পূর্ববর্তী গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয় । তাই এই দশকে বেশি বেশি তওবা ও ইস্তেগফার করা উচিত ।বান্দার অতীতের ভুলত্রুটি ক্ষমা করার জন্য এ সময় অতি গুরুত্বপূর্ণ ।

আল্লাহ তায়ালা এ দশকে বান্দার তওবা কবুল করেন । এ দশকে ইস্তেগফারের গুরুত্ব বহুগুণে বেড়ে যায় । "আস্তাগফিরুল্লাহ" বেশি বেশি পড়া উচিত । এ দশক আত্মশুদ্ধির এক সুবর্ণ সুযোগ । পিতা-মাতার জন্য দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা উচিত । আল্লাহর মাগফিরাতের দরজা এই দশকে উন্মুক্ত থাকে । আল্লাহ তায়ালা বান্দার তওবা পছন্দ করেন ।

নাজাতের দশক ঃ রমজানের শেষ দশ দিন

রমজানের শেষ দশ দিন জাহান্নাম মুক্তির দশক হিসেবে পরিচিত । এই সময় রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ইবাদতে বিশেষ মনোযোগ দিতেন । তিনি ইত্তেকাফ করতেন এবং পরিবারকেও ইবাদতে উদ্বুদ্ধ করতেন ।এই দশকে লাইলাতুল কদর লাভের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি । নাজাতের দশক আত্মশুদ্ধির শ্রেষ্ঠ সুযোগ । যারা আন্তরিকভাবে তওবা করে , তারা নাজাত লাভ করে ।

 রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এই দশকে ইবাদত আরও বেশি বাড়িয়ে দিতেন । আল্লাহ তায়ালা এই সময়ে বান্দাদের মুক্তি দান করেন । এই দশকে আল্লাহ তায়ালা্র নৈকট্য লাভের  শ্রেষ্ঠ পথ এটি । চোখের পানি দিয়ে অতীতের ভুল ধুয়ে ফেলতে হবে । অন্যায় থেকে ফিরে আসার অঙ্গীকার করতে হবে । নাজাত মানে শুধু মুক্তি নয় , আল্লাহর সন্তোষটি ।

আরও পড়ুন ঃ রমজান মাসে রোজা  রাখা ফরজ

লাইলাতুল কদর ঃ হাজার মাসের চেয়েও উত্তম রাত

লাইলাতুল কদর রমজানের শেষ দশকের কোন এক বেজোড় রাতে হয়ে থাকে । এই রাতে ইবাদত করা হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম । এই রাতে ফেরেশতারা পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং রহমত বর্ষিত হয় । এই রাত পাওয়ার জন্য শেষ দশকে বেশি বেশি নফল নামাজ , কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়া করা উচিত । গুনাহ থেকে মুক্তির  এক সুবর্ণ সুযোগ ।

লাইলাতুল কদর আল্লাহর ভালবাসা অর্জনের রাত । এই রাত বান্দাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে । আত্মসংযম তাকওয়া বৃদ্ধির রাত লাইলাতুল কদর ।এই রাত ঈমানকে নতুন ভাবে জাগ্রত করে । ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার শিক্ষা দেয় এই রাত । আল্লাহর সন্তোষটিই এই রাতের মূল লক্ষ্য । নবীজী রাসুলুল্লাহ (সাঃ) উম্মতকে এই রাত অন্বেষণের নির্দেশ দিয়েছেন ।

সেহেরি ও ইফতারের ফজিলত

রমজানে সেহরি  খাওয়া সুন্নত এবং এতে বরকত রয়েছে । দেরিতে সেহরি খাওয়া উত্তম । ইফতারের সময় দ্রুত ইফতার করা সুন্নত । খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার করা উত্তম ।ইফতারের সময় দোয়া কবুল হয় - এটি দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত । সেহরি আত্মসংযম শেখায় । সেহরি ও ইফতার উভয়ই ইবাদতের অংশ । ইফতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শিক্ষা দেয় ।

ইফতারের মাধ্যমে রোজার পরিপূর্ণতা আসে । অন্যকে ইফতার করালে বড় সওয়াব পাওয়া যায় । ইফতার করানো রোজাদারদের সমান সওয়াব কাজ । সেহরি রোজাকে সহজ করে তোলে । ইফতার রোজার ক্লান্তি দূর করে । সেহরি রোজাদারের নিয়ামত । ইফতার আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার । সেহরি ও ইফতার  রোজাকে অর্থবহ করে ।

তারাবিহ কিয়ামুল লাইল

রমজানে এশার নামাজের পর তারাবিহ আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা । তারাবিহ কোরআন তিলাওয়াতের সঙ্গে আদায় করা হয় , যা কোরআনের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্ক আরও গভীর করে । এছাড়া তাহাজ্জদ ও অন্যান্য নফল নামাজ রমজানে অধিক ফজিলত পূর্ণ । তারাবিহ শব্দের অর্থ হল বিশ্রাম নেওয়া ।  কিয়ামুল লাইল হল রাতের নামাজ । 

মাহে রমজান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বরকতময় মাস

তারাবিহ ধৈর্য, ত্যাগ ও আত্মসংযম শেখায় । তারাবিহ নামাজে সম্পূর্ণ কোরআন শোনার সুযোগ পাওয়া যায় । নিয়মিত তারাবিহ আদায়কারী আল্লাহর বিশেষ রহমত লাভ করে । তারাবিহ  মুসলমানদের মাঝে ঐক্য সৃষ্টি করে । রমজানের প্রতিটি রাতই কিয়ামুল লাইলের জন্য উপযোগী । কিয়ামুল লাইল আত্মশুদ্ধির উত্তম মাধ্যম । কিয়ামুল লাইলের মাধ্যমে অন্তরের প্রশান্তি আসে ।

আরও পড়ুন ঃ রমজান মাসে সেহরি খাওয়া সুন্নত

দান-সদকা , যাকাত ও ফিতরা

রমজান দানশীলতার মাস । রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এই মাসে সবচেয়ে বেশি দান করতেন । যাকাত ও ফিতরা আদায়ের মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষ উপকৃত হয় । এতে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা হয় । দাব- সদকা ইসলামের একটি মহান ইবাদত । সদকা মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে । গোপনে সদকা করা উত্তম আমল । যাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের  একটি । 

নির্দিষ্ট সম্পদের উপর যাকাত ফরজ ।যাকাত সম্পদকে  পবিত্র করে । যাকাত সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে । দরিদ্র ও অসহায়রা যাকাতের হকদার । ফিতরা রমজানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান । ঈদের আগে ফিতরা আদায় করা সুন্নত । প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের উপর ফিতরা ওয়াজিব । ফিতরা সময়মত আদায় করা জরুরি ।

পরিশেষে ঃমাহে রমজান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বরকতময় মাস 

মাহে রমজান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অমূল্য উপহার । যে ব্যক্তি এই মাসকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারে , তার দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই সফল হয় ।

তাই আসুন , আমরা সবাই মাহে রমজানের  প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদত , দোয়া ও নেক আমলে ভরে তুলি ।


এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

ST Bangla Hub নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url