ঈদুল ফিতরের তাৎপর্য , আনন্দ , আত্মশুদ্ধি ও বিধান

 

ঈদুল ফিতরের  তাৎপর্য , আনন্দ , আত্মশুদ্ধি ও বিধান



ঈদুল ফিতর মুসলিম উম্মার জন্য আনন্দের দিন । দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর এই দিনটি  আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার ও রহমত হিসেবে। নিম্নে আমরা ঈদুল ফিতরের সম্পর্কে জানতে পারব।


রমজান মাসে রোজা ,কোরআন তেলাওয়াত , তারাবিহ, দোয়া ও ইবাদতের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ একজন মুমিন গ্রহণ করে ঈদুল ফিতর এই সাধনার পূর্ণতা ও সফলতার প্রতীক । এটি কেবল আনন্দ উৎসবের দিন নয় বরং কৃতজ্ঞতা ,ভ্রাতৃত্ , দানশীলতা ও মানবিকতার  এক মহান উপলক্ষ্য  ।

পেজ সূচিপত্র - ঈদুল ফিতরের তাৎপর্য , আনন্দ , আত্মশুদ্ধি ও বিধান ঃ

ঈদুল ফিতরের অর্থ ও পরিচয়

ঈদুল ফিতরের ঐতিহাসিক পটভূমি 

রমজান ও ঈদুল ফিতরের গভীর সম্পর্ক

ঈদুল ফিতরের শরিয়া বিধান 

ফিতরা বা সদকাতুল ফিতর 

ঈদের নামাজের গুরুত্ব ও নিয়ম

ঈদের দিনের সুন্নত ও আদব 

 ঈদুল ফিতর ও সামাজিক সম্প্রীতি

ঈদুল ফিতর ও  দানশীলতা

ঈদের  দোয়া ও  কৃতজ্ঞতা 

পরিশেষেঃ  ঈদুল ফিতর আনন্দ ও পূর্ণতার  সফলতার প্রতীক


ঈদুল ফিতরের অর্থ ও পরিচয়

"ঈদ শব্দের অর্থ আনন্দ , উৎসব বা বার বার ফিরে আসা দিন । আর "ফিতর" শব্দটি এসেছে "ইফতার" থেকে  , যার অর্থ রোজা ভঙ্গ করা । সুতরাং ঈদুল ফিতর অর্থ  হল -রোজা শেষ হওয়ার আনন্দের দিন । ইসলামী বর্ষপঞ্জি শাওয়াল এর প্রথম  দিনটি ঈদুল ফিতর হিসেবে পালিত হয় ।  এটি মুসলমানদের জন্য একটি ফরজ  ইবাদত রোজা আদায়ের পর বিশেষ মর্যাদা পূর্ণ দিন ।

দীর্ঘ এক মাস উপবাস ও সংযম সাধনার পর দুনিয়ার মুসলমানরা এই দিনে ব্রত হতে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং  এ উপলক্ষে আনন্দ উৎসব করে  থাকে ; এজন্য এ উৎসবের নামকরণ হয়েছে ঈদুল ফিতর বা স্বাভাবিকতায় প্রত্যাবর্তন বা উপবাস- ব্রত ভঙ্গের উৎসব । ঈদের নামাজ  মুসলমানদের ঐক্যের প্রতীক । ঈদুল ফিতর দয়া ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয় ।


 ঈদুল ফিতরের ঐতিহাসিক পটভূমি

হিজরতের পর মদিনায় এসে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) দেখলেন , সেখানকার লোকেরা বছরে দুটি উৎসব পালন করে । তখন তিনি বললেন , " আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য তার চেয়ে উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন -  ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা ।" (আবু দাউদ) এভাবেই ইসলামী সমাজে ঈদের সূচনা হয় । ঈদুল ফিতর  মুসলমানদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে ।

হযরত মুহাম্মদ (সা:) মদিনায় হিজরত করে যে  যেয়ে দেখতে পান , মদিনায় তখন পারসিকদের প্রভাবে শরতের পূর্ণিমায় "নওরোজ উৎসব "এবং বসন্তের পূর্ণিমায় "মিহিরজান উৎসব" উদযাপিত হয়ে থাকে । এ দুটি বিজাতীয় উৎসবের রীতিনীতি ইসলামী রীতিনীতির পরিপন্থী ছিল বলে হযরত মুহাম্মদ (সা:) মুসলমানদেরকে এতে যোগদান হতে বিরত থাকার নির্দেশ দেন , এবং তদস্থলে ঈদুল ফিতর  ও  ঈদুল আযহা ; এ দুটি উৎসব পালনের রীতি প্রবর্তন করেন ।


রমজান ও ঈদুল ফিতরের গভীর সম্পর্ক


রমজান মাস হল তাকওয়া অর্জনের মাস । রোজার মাধ্যমে সংযম , ধৈর্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেওয়া হয় । ঈদুল ফিতর সেই  শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগের ঘোষণা । ঈদের আনন্দ যেন সীমাহীন ভোগে পরিণত না হয়ে যায় - রমজানের শিক্ষা সেটাই স্মরণ করিয়ে দেয় । তাই ঈদ মানে শুধু খাওয়া - দাওয়া নয় , বরং আত্মিক পরিশুদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ ।

রমজান ও ঈদুল ফিতরের সম্পর্ক নিবিড় ,কারণ রমজান হল সিয়াম এবং ঈদুল ফিতর হল সেই সিয়াম (রোজা) শেষ হওয়ার  আনন্দময় উদযাপন , যা উপবাস ভাঙার উৎসব হিসেবে পরিচিত এবং আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা  প্রকাশের দিন । রমজানের শেষে শাওয়াল মাসের প্রথম দিনে এই ঈদ পালিত হয় । এটি মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নেয়ামত ও খুশির উৎসব ।


ঈদুল ফিতরের শরিয়া বিধান 

ঈদুল ফিতরের দিনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান রয়েছে ।

যেমন ঃ

  • ফজরের পর ঈদের নামাজের আগে ফিতরা আদায় করা ।
  • গোসল করা 
  • পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা ।
  • সুগন্ধি ব্যবহার করা ।
  • খেজুর বা মিষ্টান্ন খাওয়া
  • তাকবীরে তাশরিক পড়া
  • ঈদের নামাজ আদায় করা (ওয়াজিব )
  • খুৎবা শোনা
  • ঈদের নামাজে যাওয়ার পথে ও ফেরার পথে ভিন্ন রাস্তা বহার করা

ঈদের নামাজের জন্য গোসল করা সুন্নত । ঈদগাহে যাওয়ার আগে কিছু মিষ্টান্ন বা খেজুর খাওয়া  সুন্নত।ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া এবং আসার সময় ভিন্ন পথ ব্যবহার করা সুন্নত । এই বিধানগুলো পালন করলে ঈদ ইবাদত ও আনন্দ উভয় দিক থেকেই পূর্ণতা লাভ করে ।

ফিতরা বা সদকাতুল ফিতর

ফিতরা বা সদকাতুল ফিতর হল ঈদুল ফিতরের দিন নামাজ আদায়ের আগে প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের জন্য ওয়াজিব একটি দান , যা রোজা পালনের ত্রুটি পূরণের জন্য  এবং গরিব-দুস্থদের ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য আদায় করা হয় । এটি নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য ( যেমন - গম, যব ,খেজুর , কিশমিশ , পনির ) অথবা তার সমমুল্যের অর্থ হতে পারে , যা নিজের ও পরিবারের সকল সদস্যের পক্ষ থেকে প্রদান করতে হয় ।

রমজানের রোজা পালনের সময় অনিচ্ছাকৃত  ভুলত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের জন্য এটি একটি ইবাদত।  ঈদের দিন যেন কোন গরিব মানুষ অভুক্ত না থাকে , সে জন্য তাদের জন্য খাদ্য বা অর্থের ব্যবস্থা করা । ধনি-গরিবের বৈষম্য দূর করে সকলের মাঝে ঈদের খুশি ছড়িয়ে দেওয়া ।

ঈদের নামাজের গুরুত্ব ও নিয়ম

ঈদের নামাজ মুসলমানদের সম্মিলিত ইবাদত । ঈদের দিন  ও ঈদের রাত্রির ফজিলত অসীম । হযরত নবী - করীম (সাঃ) যে পাঁচটি রাত্রিতে দোয়া কবুল হওয়ার কথা বলেছেন , ঈদুল ফিতরের রাত্রিটি এদের অন্যতম । হযরত নবী - করীম (সাঃ) বলেন , "প্রত্যেক জাতিরই খুশির দিন থাকে , আর আমাদের খুশীর দিন হল ,ঈদুল ফিতরের দিন ।" ( বোখারী ও মুসলিম শরীফ )

খোলা ঈদগাহ মাঠে জামাতের সাথে ঈদের নামাজ পড়তে হয় । নামাজের আগে আজান ও ইকামত নেই । দুই রাকাতের ওয়াজিব নামাজের নিয়ত করে ছয় তাকবীরের সাথে পড়তে হয় । নামাজ শেষে ইমাম দাঁড়িয়ে খুৎবা পাঠ করবেন ।  খুৎবা পাঠ  শেষে ইমাম হাত উঠিয়ে  মুক্তাদিগণসহ মুনাজাত করবেন । এটাই মুসলমানদের ঐক্য ও সাম্যের দৃশ্যমান প্রতীক ।


ঈদের দিনের সুন্নত ও আদব

ঈদের দিনের সুন্নত কাজ সমূহ ঃ
  • অতি প্রত্যুষে শয্যা ত্যাগ করা ।
  • মিসওয়াক করা এবং গোসল করা ।
  • সাদ্য অনুযায়ী পরিস্কার - পরিচ্ছন্ন ভালো পোশাক পরিধান করা ।
  • আতর ইত্যাদি কোন খোশবো  ব্যবহার করা ।
  • সাধ্য পরিমাণ মিষ্টান্ন খাওয়া ।
  • ঈদের নামাজে যেতে অযথা বিলম্ব না করা ।
  • ঈদগাহে গমনের পূর্বেই 'সদকায়ে ফিতর" আদায় করা ।
  • ঈদগায়ে এক পথে যাওয়া আর  ফিরার সময় অন্য পথে আসা ।
ঈদের দিন সব মুসলিমদের আদবাদি মেনে চলা উচিৎ । ঈদের দিন আত্মীয় - স্বজন , পাড়া প্রতিবেশী ও মুসলিম ভাইদের সাথে সাক্ষাত করে সালাম বিনিময় করা । তারপর সব হিংসা - বিদ্বেষ পরিহার করা ঈদের গুরুত্বপূর্ণ আদব । আল্লাহ তায়ালা সবাইকে যেন ঈদুল ফিতরের আদব যথাযথ ভাবে মেনে চলার তাওফিক দান করেন ।

 ঈদুল ফিতর ও সামাজিক সম্প্রীতি

ঈদুল ফিতর মুসলমানদের একটি ধর্মীয় উৎসব । এটি সাম্য, মৈত্রী ও সামাজিক সম্প্রীতির এক মহান উৎসব ; যা রমজানের আত্মশুদ্ধির পর বৈষম্য ভুলে সকলকে একত্রিত করে । যাকাত ও ফিতরার মাধ্যমে দরিদ্রদের স্বাবলম্বন করানো যায় , পারস্পারিক শুভেচ্ছা বিনিময় , আত্মীয় - প্রতিবেশীদের বাড়ি যাওয়া  এবং সকলে মিলেমিশে আনন্দ উদযাপনের মাধ্যমে এটি সামাজিক দৃঢ় হয় ।

ঈদ এমন এক উপলক্ষ্য যেখানে সকলে ভেদাভেদ ভুলে মানবতার জয়গান গায় এবং পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ পায় । ঈদে নতুন পোশাক কেনা ,মসজিদে যাওয়া , ইফতার করা , একে অপরকে দাওয়াত দেওয়া  - সবই সামাজিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয় । ঈদ পারস্পারিক ভালোবাসার বার্তা নিয়ে আসে এবং সামাজিক সম্প্রীতি প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।


ঈদুল ফিতর ও  দানশীলতা


ঈদুল ফিতর  শুধু আনন্দ উৎসব নয় , এটি দানশীলতার প্রতীক , যেখানে রমজানের সংযমের পর  গরিব- দুখীর হাসি ফোঁটাতে সদকাতুল ফিতর  নামে বাধ্যতামূলক দান করা ইসলামে বিধান রয়েছে , যা দরিদ্রদেরও ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে  এবং সমাজে সাম্য করতে সাহায্য করে , একই সাথে এটি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও তাকওয়ারও বহিঃপ্রকাশ ।

ঈদুল ফিতরের মূল শিক্ষা হল ব্যক্তিগত সংযমের পাশাপাশি সমাজের গরীব ও অভাবী মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন করা  এবং সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে আনন্দ উদযাপন করা , আর এই দায়িত্ব পালনের অন্যতম উপায় হল সাদকাতুল ফিতর বা ফিতরা প্রদান করা ।

ঈদের  দোয়া ও  কৃতজ্ঞতা 


ইদের দোয়া ও কৃতজ্ঞতা হল আল্লাহর  শুকরিয়া আদায় এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যমে আনন্দ উদযাপন , যেখানে " তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা " বলে শুভেচ্ছা বিনিময় করা হয় , তাকবীর পাঠ করা হয় , নতুন চাঁদ দেখে বিশেষ দোয়া পড়া হয় এবং ঈমানের সাথে জীবন যাপনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয় , যা রমজানের ইবাদত কবুল হওয়ার এবং উম্মাহর কল্যাণ কামনার অন্তর্ভুক্ত ।

নামাজের পর দেশ , জাতি ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য  দোয়া করা হয় । রমজানের মাসব্যাপী ইবাদত ও নেক আমল কবুল হওয়ার শুকরিয়া আদায় করা হয় । দরিদ্র ও অভাবী মানুষদের কথা স্মরণ করে তাদের দোয়া করা এবং সামাজিকভাবে তাদের পাশে দাঁড়ানোও কৃতজ্ঞতার অংশ ।


পরিশেষেঃ  ঈদুল ফিতর আনন্দ ও পূর্ণতার  সফলতার প্রতীক

ঈদুল ফিতর  শুধু  একটি উৎসব নয় ; এটি মুসলিম জীবনের এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় । আত্মসংযমের পর আনন্দ ,ইবাদতের পর পুরস্কার এবং পর প্রশান্তির নামই ঈদ ।

আসুন আমরা ঈদের প্রকৃত শিক্ষা হৃদয়ে ধারন করতে পারি , তবেই আমাদের ব্যক্তি , পরিবার ও সমাজ হবে আরও সুন্দর ও মানবিক ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

ST Bangla Hub নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url